Tasnimul Hasan:
"সুলতান বাইবার্স ০১"The Father of Conquest.
"মহান আল্লাহর কাছে আমি আশা রাখি, যদি আমার ভাগ্যে শাহাদাত নসিব হয়, তবে ধূলিময় শকুনের থলে থেকে সবুজ পাখির থলেতে আমার সমাধি হবে। আমি বিজয়ী হলে গতকাল আমাকে সুখী করতে পারবেনা; বরং আমার আজই গতকালের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে"[১]
আলপ আরসালান জানতেন তিনি যদি শহীদ হতেন ওনার কবর হতো শকুনের পেট! আজ আমরা যার আলোচনা শুনতে যাচ্ছি তিনি হলেন 'আল-মালিক আল-যাহির সুলতান রুকন-আদ-দ্বীন আল-বাইবার্স আল-বুন্দুক্বদারী'। ওনার জন্ম ১২২৩/১২২৮ সাল। ওনার সম্পর্কে জানার পূর্বে আমি ওনার সময়কার মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে একটু আলোকপাত করে নিতে চাই। যাতে পাঠক কিছুটা হলেও তখনকার বৈশ্বিক পরিস্থিতিটা আচ করতে পারেন
১] মধ্য-এশিয়া- পৃথিবীতে যতগুলো সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি মুসলিম নেশনের উপর তাদের সৈন্য-সামন্ত নিয়ে হামলে পড়েছিল তাদের মধ্যে কুখ্যাতির মানদণ্ডে অন্যতম ছিল মোঙ্গল সাম্রাজ্য। সুলতান বাইবার্স আসার পূর্বেই গোটা মধ্য এশিয়াকে মোঙ্গলরা কসাইখানা বানিয়ে ফেলেছিল। ছবিতে বিবরণসহ আছে দেখে আসুন। তবে গোটা মধ্য এশিয়াকে কসাইখানা বানানোর পূর্বে চেঙ্গিস খান যেই সিংহের কামড় খাওয়ার ভয়ে থাকতেন তিনি ছিলেন জালাল-আদ-দ্বীন মেংগুওয়ার্দী/ মিংভার্নু/মেন্দিরমান। অল্পসল্প বাহিনী নিয়েও জালাল-আদ-দ্বীন তার দুর্ধর্ষ মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি দিয়ে মোঙ্গলদের ভালোই পিটিয়েছিল। তার সাথে স্বয়ং কসাই চেঙ্গিজ খানেরই যুদ্ধ হয়েছিল। যুবক জালাল-আদ-দ্বীনের পার্ফর্মেন্স দেখে খান বলেছিলেন-
"ধন্য হোক সেই মা এর পেট যেই পেটে এমন সন্তানের জন্ম হয়, বাপের তো চাই এমনই এক ব্যাটা। আহ আমার যদি এমন একটা ছেলে থাকতো"[২]
এমনকি ইতিহাসবিদগণ এটাও বলেছেন যে চেঙ্গিজ খান জালাল-আদ-দ্বীন মেঙ্গুওয়ার্দীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কারণ খান তাকে পরখ করে দেখতে চেয়েছিলেন। গোটা মধ্য-এশিয়াকে রক্তে ডুবিয়ে খান তুর্কান খাতুনকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যান।
২] উপমহাদেশ- উপমহাদেশের শাসনকর্তা ছিলেন তখন শামস-উদ-দ্বীন ইলতুতমিশ। তিনি ছিলেন পরহেজগার, নেককার, সুঠাম, চৌকস একজন তুর্কী মামলুক সুলতান। জ্বী, উপমহাদেশে তখন চলছিল মামলুক সালতানাত।
ওনার সময়ে নতুন নতুন কিছু সমস্যার উপদ্রব হয় দিল্লী সালতানাতে। সেগুলোর সমাধান করে সুলতান ইলতুতমিশ দিল্লী সালতানাতের ভিতকে আরও শক্তিশালী করেন। ১২২৭-১২৩৬ সাল পর্যন্ত সুলতান ইলতুতমিশ ওনার সামরিক মিশন পরিচালনায় ব্যস্ত ছিলেন।
সুলতান ইলতুতমিশের চারিত্রিক গুণাবলী অত্যন্ত সুন্দর ছিল, তিনি দেখতেও অনেক সুদর্শন ছিলেন। ইতিহাসবিদরা সেভাবেই উল্লেখ করেছেন। ওনাকে বলা হয় 'আল্লাহর রাজ্যের রক্ষক'।
সুলতান জালাল-আদ-দ্বীন মেঙ্গুওয়ার্দী ইলতুতমিশের শাসনামলে উপমহাদেশের পাঞ্জাবে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা করলে উপমহাদেশের উপর চেঙ্গিজের চোখ পড়বে তাই উপমহাদেশের মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি জালাল-আদ-দ্বীনকে আশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
৩] হিস্পান/স্পেন- স্পেনের মুসলিম স্টেট একেবারে শুরু থেকেই সেখানকার ক্রিশ্চান শক্তিগুলোর সাথে টক্কর দিয়ে আসছিল। সেখানকার মুসলিম শক্তিগুলোকে কৌশলে ক্রিশ্চান অপনেন্টগুলো বিভক্ত করে রেখেছিল নানাবিধ ষড়যন্ত্রের বীজ বুনে। ১১১২ সালে স্প্যানিশ, পর্তুগাল ও ফরাসি ক্রিশ্চান জোট সিয়েরা মরেনা পর্বতমালার পাদদেশে সমবেত হয়। তারা স্পেনের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়, এ যুদ্ধের নাম ছিল ওকাবের যুদ্ধ। মুসলমানেরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
"প্রায় ১ লক্ষ্ মুসলমান সেনা শাহাদাতবরণ করেন"
এ যুদ্ধের পর মুয়াহিদুনদের ক্ষমতার মূলভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায় বলেই ইতিহাসবিদরা মন্তব্য করেছেন। ১২২৮ সাল থেকে ১২৪৮ সালের মধ্যে (সুলতান বাইবার্সের জন্মসাল হিসেবে বিবেচিত) ভ্যালেন্সিয়া, বাদাজোজ, মাজরোকা, মুর্সিয়া, জায়েন এবং অন্য আরেকটি শহর খৃষ্টানদের নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। ১২৩৬ সালে মুসলিম কর্ডোভারও পতন হয়।
ক্রিশ্চান বাহিনী মসজিদগুলোকে ক্যাথেড্রালে পরিণত করে।
৪] পশ্চিম-আফ্রিকা - ১২০০ সালের দিকে পশ্চিম আফ্রিকায় ছিল মালি সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন সুফি সুনদিয়াতা কেইতা (রহঃ)। ইনিই পশ্চিম আফ্রিকায় বা ইফ্রিক্বিয়্যায় মুসলিম মালি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
তারই উত্তরসুরীগণ পরবর্তীতে মালি অঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ করে তোলেন। এই মালি অঞ্চলেরই একজন শাসক ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত 'মানসা মূসা'।
গোটা মুসলিম বিশ্বের বেশীরভাগ অংশই তখন সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে এশিয় মুসলিম দেশগুলো। কারণ মোঙ্গলরা পূর্ব থেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পশ্চিমে আসছিল, আর ক্রূসেডাররা পশ্চিম থেকে পূর্বে। মুসলিম বিশ্ব যেন এমন সংকটে আগে কখনও পড়েনি।
মোঙ্গলরা যা করলো সুলতান বাইবার্স আসার আগে-
১] চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য ১২১৯ সালে এসে কোরিয়ার বর্ডার থেকে শুরু করে পারস্যের কিনারা অবধি বিছানো ছিল।
২] ১২০০-১২২০ সালের মধ্যে মোঙ্গলদের পার্শ্ববর্তী মুসলিম শক্তি হিসেবে টিকে ছিল 'খাওয়ারিজম' সাম্রাজ্য।
৩] ১২১৯ সালে খানের টেরিটরি খাওয়ারিজমের বর্ডার পর্যন্ত পৌছে যায়।
৪] ১২২২ সালে খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
৫] মোঙ্গলরা যেকোনো শহরে ঢুকে প্রথমে যেটা করতো-
*সেখানকার বিজ্ঞ-যোগ্য লোক ও জ্ঞানী ইসলামিক স্কলারদের হত্যা করতো
*লাইব্রেরী ও ইসলামিক আর্কিটেকচারগুলোকে ধূলোয় মিশিয়ে দিতো ও
* মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালাতো।
৬] ১২৫৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী হালাকু খানের সেনারা শতশত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাগদাদকে দখল করে নেয়।
এই ছিল মূলত পরিস্থিতি, বাগদাদ দখল করে মোঙ্গলদের টার্গেট ছিল সিরিয়া, মিশর ও ফিলিস্তিন।
সুলতান রুকন-আদ-দ্বীন বাইবার্সের জন্মসাল ১২২৩ কারও মতে ১২২৮ সালে। তিনি ছিলেন একজন সুঠামদেহী কিপচাক তুর্কী। ওনার ডাকনাম ছিল আবুল ফুতুহ বা Father of Conquest। মিশরে বাহরিয়্যা আমলে তিনি ৪র্থ মামলুক সুলতান ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কমান্ডার যিনি ৭ম ক্রূসেড যুদ্ধে অংশগ্রহ করেছিলেন এবং আইন-জালুত যুদ্ধেরও একজন কমান্ডার ছিলেন, যেখানে তিনি ভ্যানগার্ডের দায়িত্বে ছিলেন। ইতিহাসবিদগণ বলেন বাইবার্সের সময়কালীন ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ানে মামলুকদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তাছাড়াও মামলুক সালতানাতের ভিতও দৃঢ় হয়। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ক্রূসেডারদেরকে বিতাড়িত করে সেখানকার মুসলিম শক্তিগুলোকে এক করতে পেরেছিলেন, বলে ইতিহাসবিদগণ বলে থাকেন।
প্রশ্নঃ১ বাইবার্স মানে কি?
উত্তরঃ- বাইবার্স দ্বারা বোঝানো হয় "The Great Panther". এটা টার্কিক নেটিভ ভাষায় বোঝায়, বেয় অর্থ - আমীর আর পার্স অর্থ- প্যান্থার বা লেওপার্ড দুটো মিলে হয় বেয়বার্স অর্থাৎ Great Panther বা Lord Panther. তাছাড়াও ওনাকে আরবে বলা হতো মরু-সিংহ। অর্থাৎ বাইবার্স দ্বারা সিংহও বোঝানো হয়।
বাইবার্সের একটি নির্দিষ্ট ব্লেজন ছিল। পাঠকের সহজে বোঝার জন্য- ব্লেজন মানে প্রতীক। বাইবার্স যে ব্লেজন ব্যবহার করতেন, তাতেও একটি প্যান্থার আকা থাকতো। বাইবার্স যে ব্রিজ তৈরী করেছিলেন সেখানেও প্যান্থার/সিংহ এর চিহ্ন থাকতো।
সেই ব্রিজে যে চিহ্নটি ছিল তাতে দেখা যায় একটি সিংহ বনাম একটি ছোট্ট ইদুর। সিংহটি দ্বারা বাইবার্সকে ইঙ্গিত করা হয় আর ইদুর দ্বারা ক্রূসেডার কমান্ডারকে।
সুলতানের জন্মস্থান সম্পর্কে ইতিহাসবিদগণ বলেছেন তিনি দাশ্ত-ই-কিপচাকের বাসিন্দা ছিলেন। ছবিতে দেওয়া আছে দাশ্ত-ই-কিপচাক সম্পর্কে, এটাকে কুমানিয়াও বলা হতো। সুলতান বাইবার্স দাশ্ত-ই-কিপচাকের এদিন এবং ইয়াইক নদীর মাঝের একটি জায়গায় জন্মগ্রহণ করেন বলে জানিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। কেউ কেউ বলেছেন ওনার জন্ম ক্রিমিয়ায়। কিপচাক তুর্কীদের ট্রাইব বা বেয়লিক থাকতো। সুলতান বাইবার্স ছিলেন 'বারলি' বেয়লিকের ছেলে।
একজন কুমান তুর্কী বদর-উদ-দ্বীন আল-বায়সারী ছিলেন একজন চাক্ষুস শাক্ষী যে বারলি বেয়লিক বুলগেরিয়ায় থাকাবস্থায় সেখানে তাদের উপর মোঙ্গলরা আক্রমন করেছিল। শিশু বাইবার্সের চোখের সামনেই তার পিতা-মাতা সহ একে একে পুরো বেয়লিকটার উপর মোঙ্গলরা চালায় ম্যাসাকার বা গণহত্যা। পরবর্তীতে বায়সারী ও বাইবার্সকে দাস হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয় আজকের এই তুরষ্কে। তখন সেখানে ছিল সালতানাত-ই-রুম। সেখানে সিভাশে তাদেরকে দাস বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাইবার্সকে সিরিয়ার হামা থেকে এসে একজন উচ্চপদস্থ মিশরীয় কর্মকর্তা কিনে নেন, সেই লোকটির নাম ছিল 'আলা-আদ-দ্বীন ইদিকিন আল-বুনদুকদারী'। ইদিকিন বাইবার্সকে কায়রোতে নিয়ে যান। ১২৪৭ সালে ইদিকিন মিশরের সুলতান সালেহ আইয়্যুবি কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং ওনার দাসদেরকে বাজেয়াপ্ত করা হয়, বাইবার্সও সেখানেই ছিলেন।
প্রশ্নঃ২ বাইবার্স দেখতে কেমন ছিলেন?
উত্তরঃ ইতিহাসবিদদের মতে সুলতান বাইবার্স ছিলেন স্বর্নাভ সাদা ত্বকের। ওনার মুখ ছিল বড়ো ও চোখগুলো ছিল ছোট। উনি খুব লম্বা ছিলেন আরব-তুর্কী ছেলেদের ন্যয়। ওনার একটা চোখ ছিল হালকা নীলাভ, যাকে ইতিহাসবিদরা বলেছেন, Cataract in one of his eyes.
পরবর্তীতে বাইবার্স আইয়্যুবীদের আওতায় একজ্ন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। ১২৪৪ সালে একটি যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধের নাম ছিল 'দ্যা ব্যাটেল অফ লা ফর্বি' সে যুদ্ধে বাইবার্সও অংশগ্রহণ করেছিলেন যা পূর্ব গাজায় সংঘটিত হয়েছিল। বাইবার্স ১২৫০ সালের ৭ম ক্রূসেডেও উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথেই সেখানে যুদ্ধ করেছিলেন। এভাবে নানা চড়াই উতড়াই পেরিয়ে সুলতান বাইবার্স হন একজন মুসলিম কমান্ডার, ওনার জীবনটা খুবই নাটকীয়। ১ম এ তিনি তুর্কী গোত্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেন, পরে ওনাকে এক মিশরীয় কর্মকর্তা কিনে নেয় সেখান থেকে তিনি গড়ে ওঠেন মিশরে, পরবর্তীতে আইয়্যুবীদের আওতায় একজন কমান্ডার হিসেবে উঠে আসেন।
Reference
[১] সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস- ড আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী, মুহাম্মদ প্রকাশনী। [পৃষ্ঠা-১৬]
[২]সানজাক-ই-উসমান-প্রিন্স মুহাম্মাদ সজল [পৃষ্ঠা-৭২]
Comments
Post a Comment
Comment your reading experience to us.